তেজপাতা রক্তের সুগার লেভেল কমায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। চুলের গ্রোথ বাড়াতে, খুশকি কমাতে ও স্ক্যাল্পের চুলকানি কমানোর জন্যও এটি চমৎকার। তেজপাতা আপনার পরিপাকতন্ত্রের জন্যও উপকারী। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে তেজপাতা ক্যান্সার সেল ধ্বংসেও ভূমিকা রাখতে পারে।

 

এশিয়ান খাবারের উপকরণ হিসাবে তেজপাতার পরিচিতি। সতেজক ও সুগন্ধী উপকরণ (herb)। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে তেজপাতা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। bay leaf বা bay-laurel আসে lauraceae ফ্যামিলি থেকে। চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসা এই ঔষধি উপাদান সম্মানের প্রতীক হিসাবেও পরিচিত। প্রাচীনকালে গ্রীকরা তাদের বীর ও অলিম্পিয়ানদেরকে তেজপাতার জয়মাল্য দিয়ে বরণ করত।

 

সুপ, রাইস, স্টু এবং বিভিন্ন সুস্বাদু ডিশ প্রস্তুতিতে তেজপাতার ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। কেন আপনারও উচিৎ নিজের লাইফস্টাইলে তেজপাতা যোগ করা, তা নিয়েই এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

 

 

তেজপাতার উপকারিতা

 

১- চুলের গ্রোথ বাড়ায় ও খুশকি দূর করে

খুশকি ও চুল পড়া নিয়ে ভুগছেন? তেজপাতা ট্রাই করে দেখুন। চুলের জন্য উপকারী পদার্থে ভরপুর এই তেজপাতা চুলের সমস্যার প্রাচীন ঔষধ। পানিতে কয়েকটি পাতা দিয়ে ফুটিয়ে নিন। ঠাণ্ডা হওয়ার চুল আর স্ক্যাল্প (scalp) এই পানি দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলুন। অবশ্যই চুলে শ্যাম্পু করার পর এটি করবেন। স্ক্যাল্পে চুলকানি? তেজপাতা পিষে নারিকেলের তেলের সাথে মিশিয়ে নিন। স্ক্যাল্পে লাগিয়ে ৩০ মিনিট রাখুন। কুসুমগরম পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলুন।

 

 

২- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে

এক গবেষণায় দেখা গেছে যারা দিনে দু’বার চূর্ণ তেজপাতা খেয়েছেন, তাঁদের রক্তের সুগার লেভেল কমেছে। দেখা গেছে তেজপাতায় এমন উপাদান আছে যা ইনসুলিনকে কার্যকরী হারে প্রসেস করতে সাহায্য করে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্যও এটি উপকারী। গবেষণায় আরো দেখা গেছে সার্বিক কোলেস্টেরল লেভেল কমাতেও এটি ভূমিকা রাখে।

 

 

 

৩- পরিপাকে সাহায্য করে

কোষ্ঠকাঠিন্য? ব্লোটেড (bloated) বোধ করছেন? তেজপাতা আপনার পরিপাকতন্ত্রকে ঠিক রাখবে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ধরা হয় তেজপাতা আন্ত্রিক অগ্নিতে সাহায্য করে। এর মূত্রবর্ধক বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয় ও পরিপাক রসকে উদ্দীপ্ত করে। তেজপাতায় বিদ্যমান এনজাইমগুলোও খাবারকে কার্যকরভাবে পরিপাক করতে সাহায্য করে। এটি পেটের সমস্যায় ভোগা যে কারো জন্য উপকারী। এক গবেষণায় দেখা গেছে পেটের বিভিন্ন সমস্যা কমাতেও তেজপাতা ভূমিকা রাখে।

 

 

৪- হৃৎপিণ্ড ভাল রাখে

তেজপাতায় রুটিন ও ক্যাফিক অ্যাসিড (rutin and caffeic acid) আছে। এই যৌগগুলো হৃৎপিণ্ডের দেয়ালকে মজবুত করে ও কোলেস্টেরল লেভেল কমায়। কোলেস্টেরলের লেভেল হাই থাকলে তা হৃৎপিণ্ডে রক্ত চলাচলে বাধা দেয়, ফলে হার্ট অ্যাটাক অথবা স্ট্রোক হতে পারে।

 

 

৫- ব্যাথা কমায়

তেজপাতার অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি (anti-inflammatory) গুণাবলীও আছে। ফলে যে কোন ধরণের মচকে যাওয়া, হাড়ের জোড়ার ব্যাথা এমনকি আর্থ্রাইটিসে ভোগা মানুষদের কাজে দেয় এটি। তেজপাতা ও ক্যাস্টর পাতা পিষে পেস্ট বানিয়ে ব্যাথার স্থানে পেস্টটি লাগিয়ে রাখুন ২০ মিনিটের মত। আবার, মাধা ধরা সারানোর প্রাচীন চিকিৎসা হল তেজপাতার তেল কপালে লাগানো।

 

 

৬- ক্যান্সার-বিরোধী ইফেক্ট

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে তেজপাতা ক্যান্সার সেল ধ্বংসে সাহায্য করে। এটি ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট ও ক্যাটেকিনে (phytonutrients and catechins) ভরপুর, এই যৌগগুলো ক্যান্সার সেলের মোকাবেলা করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে তেজপাতার নির্যাস ব্রেস্ট ক্যান্সার সেল ধ্বংসে সাহায্য করে।

 

 

 

৭- ক্ষতস্থানের আরোগ্য ত্বরান্বিত করে

অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যের কারণে ক্ষতস্থানের চিকিৎসায় তেজপাতার পেস্টের ব্যবহার সেই প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। ক্যানডিডার (candida) ফাঙ্গাল ইনফেকশনের চিকিৎসায়ও এটি ব্যবহারযোগ্য।

 

 

৮- গলাব্যথায় আরাম দেয় ও কফ কমায়

তেজপাতার আরেকটি দারুণ দিক হল এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের পুরো তন্ত্রকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। ঠাণ্ডা লাগলে বা কাশি হলে তেজপাতা আপনার বন্ধ বায়ুনালীকে খুলে দিতে এবং ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করতে সাহায্য করে। ৪-৫টি তেজপাতা পানিতে ফুটান। একটু ঠাণ্ডা হওয়ার পর একটি পরিষ্কার কাপড়ের টুকরা ঐ পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে বুকে লাগান। খেয়াল রাখবেন কাপড়টি যেন খুব বেশি গরম না থাকে।

 

 

৯- কিডনির পাথর দূর করে

এক গবেষণায় দেখা গেছে তেজপাতা দেহের ইউরিয়েজ (urease) লেভেল কমাতে সাহায্য করে। শরীরে ইউরিয়েজের পরিমাণ বেশি হলে কিডনিতে পাথর হতে পারে ও অন্যান্য গ্যাস্ট্রিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

 

 

১০- দুশ্চিন্তা ও স্ট্রেসের মোকাবেলা করে

দিন শেষে রিল্যাক্স করতে সমস্যা বোধ করলে এক কাপ তেজপাতার চা নিয়ে বসুন। এটি আপনার স্নায়ুকে শান্ত করবে, দুশ্চিন্তা কমাবে, এমনকি ঘুমও আনবে। ঘুমানোর আগে এক কাপ চা খেতে পারেন।

 

 

সাবধানতা

তেজপাতা সাধারণত নিরাপদ হলেও প্রেগন্যান্ট ও ব্রেস্টফিডিং নারীদেরকে তেজপাতা সেবনে নিষেধ করা হয় কারণ এতে ইউটেরাইন কনট্র্যাকশন (uterine contraction) হতে পারে। উপরন্তু, যে কোন সার্জারি, বিশেষত সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম সম্পর্কিত কোন সার্জারির কম পক্ষে দুই সপ্তাহ আগে থেকেই তেজপাতা খাওয়া বন্ধ করা উচিৎ।